‘সংলাপে যে ফল আশা করেছিলাম, তা দেখতে পাইনি’

0
227
আরাফাত সেতু

নবগঠিত বিরোধী রাজনৈতিক জোট জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের সঙ্গে গতরাত (১ নভেম্বর) গণভবনে সাড়ে তিন ঘণ্টা সংলাপ করেছে ক্ষমতাসীন ১৪ দলীয় জোট। কিন্তু সংলাপ থেকে দেশে চলমান রাজনৈতিক সঙ্কট সমাধানের কোনো বার্তা পাওয়া যায়নি।

ঐক্যফ্রন্ট এবং ১৪ দলের বহুল প্রত্যাশিত সংলাপ নিয়ে আজ (২ নভেম্বর) দ্য ডেইলি স্টার অনলাইনের সঙ্গে কথা বলেছেন বাংলাদেশের দুই বিশিষ্ট ব্যক্তিত্ব সুলতানা কামাল ও অধ্যাপক সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম।

তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা মানবাধিকারকর্মী সুলতানা কামাল বলেন, “আমরা যে ফল আশা করেছিলাম, তা দেখতে পাইনি। উভয় পক্ষের প্রতিক্রিয়াতেই তা স্পষ্ট হয়ে গেছে। আমরা ভেবেছিলাম যে, বহু চিন্তা-ভাবনা করে এতোদিন পর যখন প্রধানমন্ত্রী নিজে এই সংলাপ প্রস্তাবে সাড়া দিলেন, সেখানে আলোচ্যসূচী অনুযায়ীই গঠনমূলক আলোচনা হবে। শুধুমাত্র পরস্পরের কথা বলার জন্য একত্রিত হওয়া, সেটিই যে সংলাপের মূল আলোচ্য বিষয় হয়ে যাবে, তা ভাবিনি।”

“আমরা তো তেমন কিছু দেখতে পাইনি। বিষয়ভিত্তিক আলোচনা হয়েছে কি না কিংবা যে চিন্তা-ভাবনা ছিলো সেগুলো নিয়ে আলাপ হয়েছে কি না এবং কোনো সহমতে এসে তারা বলতে পারছেন কি না, যে আমরা কালকের সংলাপ পরবর্তী পর্যায়ে এই জায়গায় এসে পৌঁছালাম, এখান থেকে আমরা উভয় পক্ষই জানি যে, আমাদের পরবর্তী পদক্ষেপগুলো এই হবে। সে রকম তো কিছু আমরা দেখলাম না। কোনো উপসংহারে তারা পৌঁছুতে পেরেছেন বলে আমার মনে হয় না। সে জন্য সংলাপটি আমাদের কাছে একটু হতাশাবাঞ্জকই রয়ে গেলো। তারা যতোই বলুক না কেনো আবার বসবো, আবার আলোচনার সুযোগ আছে, কিন্তু সুযোগটা কেমন করে থাকবে, সময় তো শেষ হয়ে যাচ্ছে,” যোগ করেন সুলতানা কামাল।

তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক এই উপদেষ্টা বলেন, “দেশে রাজনৈতিক দলগুলোই সংকট তৈরি করে। তারা যদি সিদ্ধান্ত নেয় যে, তারা সংকট তৈরি করবে না। তারা তাদের মন মতো কাজগুলো করে যাবে, তাহলে পরে এই সংকট তৈরি হয় না। তবে এখানে সবচেয়ে বড় দায়িত্ব ক্ষমতাসীন দলের উপরই বর্তায়। ক্ষমতাসীন দলের নিশ্চিত করা উচিত, অন্যদের রাজনৈতিক প্রক্রিয়া তারা বাধাগ্রস্ত করবে না, যেটা বিভিন্ন সময় দেখা গেছে। তবে অন্তত এটুকু আশ্বাস প্রধানমন্ত্রীর কাছ থেকে পাওয়া গেছে যে, সভা-সমাবেশ করতে দেওয়া হবে। সেক্ষেত্রে কিছু উপদেশ-নির্দেশও দিয়েছেন। কিন্তু, তারপরেও আমার মনে হয় যে, রাজনৈতিক দলগুলো যদি চায় আর সংকট তৈরি না করে তারা নির্বাচন পর্যন্ত নিজেদের অবস্থানে থেকে চেষ্টা করবে যেনো নির্বাচনটা সুষ্ঠু হয়, তবেই মঙ্গল। তাহলে হয়তো নির্বাচন সুষ্ঠু হতে পারে। গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার একটা বিষয় হলো যে, আমরা তো রাজনৈতিক দলের উপর পুরো ক্ষমতা ন্যস্ত করে দিই। আমাদের দায়-দায়িত্ব দিয়ে দিই। কিন্তু, এই অর্পিত ক্ষমতা যদি তারা সঠিকভাবে পালন না করে কখনই নির্বাচন সুষ্ঠু হবে না।”

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের অধ্যাপক সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম বলেন, “সংলাপের বিষয়টি এতোটাই পরিব্যাপ্ত যে, সেটি একদিনের আলোচনায় নিষ্পত্তি হওয়ার সম্ভাবনা বা সুযোগ কম। নিষ্পত্তি তখনই হয়, যখন দুটো দলের ওপর পরস্পরের আস্থা থাকে। এখানে তো আমরা চাচ্ছি, একটা নমনীয় অবস্থানে থেকে দুটো পক্ষই সর্বাত্মক সমাধান চেষ্টায় আলোচনা করবে।”

তিনি বলেন, “গতকালের সংলাপ নিয়ে আমীর হোসেন আমু বলেছেন, আলোচনা ভালো হয়েছে। মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেছেন, তিনি খুব সন্তুষ্ট নন। আমার আন্দাজ হচ্ছে যে, কিছুটা সন্তুষ্ট তাহলে হয়েছেন তারা। আমরা যেহেতু এখনও বুঝতে পারিনি যে, ঠিক কী বিষয় নিয়ে আলোচনা হয়েছে, কী কী নিষ্পত্তি হয়েছে। পত্রিকা পড়ে এবং টেলিভিশন দেখেও বিষয়টি আমি স্পষ্ট করতে পারিনি। আমার কাছে মনে হয়েছে, মামলা দেবে না- এই ধরণের কিছু ঐকমত্য হয়েছে।”

“জনসভা করতে বাধা-বিপত্তি দেওয়া হবে না, এটি একটি বড় অগ্রগতি বলে আমি মনে করি। নির্বাচন কমিশন পুনর্গঠন সরকার মানবে না। নির্বাচনকালীন সরকার ও তত্ত্বাবধায়ক সরকারও মানবে না। তবে নির্বাচনকালীন সরকারে বিরোধী দলগুলোর কিছু প্রার্থীকে জায়গা করে দেওয়ার একটা সুযোগ হয়তো থাকে। টেকনোক্রেট মন্ত্রী কোথায় কোথায় আছে সে জায়গাগুলোতে তাদের স্থান দেওয়া যেতে পারে। আমার কাছে মনে হয়েছে যে, আরেকবার তারা আলোচনায় বসবে এবং অন্য দুই দল বিকল্পধারা ও জাতীয় পার্টির সঙ্গে আলাপের পর হয়তো আরও টুকটাক কিছু সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে,” মত দেন তিনি।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এই অধ্যাপক মনে করেন যে আলোচনার পর বিএনপির মতোই বিকল্পধারা এবং জাতীয় পার্টিও একই প্রতিক্রিয়া দেখাতে পারে। “সুতরাং গতকাল যে আলোচনা হয়েছে তার মধ্যে যেকোনো একটি বিষয়ের নিষ্পত্তি হয়েছে ধরে, অপরদিকে বিকল্পধারার সঙ্গে হয়তো সব বিষয়ে নিষ্পত্তি হয়ে যেতে পারে, তাতে প্রধানমন্ত্রী এই দেশের মানুষকে দেখাতে পারবেন যে, আমি তো সবার কথা শুনেই এরপর সিদ্ধান্ত নিচ্ছি। তবে এটাকে ‘উইনিং সিচ্যুয়েশন’ বলা যাবে না। আবার ‘লুজিং সিচ্যুয়েশন’ও না। এখানে কিছু কিছু অর্জন দুই পক্ষেরই হয়েছে।”

“তবে প্রাপ্তি যেটি হয়েছে, সেটি আমাদের গণতন্ত্রের। যখন আমরা আশা ছেড়ে দিচ্ছিলাম যে, পরিস্থিতি সংঘাতের দিকে যাচ্ছে, হানাহানির পরিবেশ সৃষ্টি হচ্ছে। সেখান থেকে কতটা বের হয়ে আসা গেছে, এখনও বলা মুশকিল। তবে আমার মনে হয় না, দেশ কোন সহিংসতার দিকে যেতে প্রস্তুত অথবা মানুষ প্রস্তুত। অংশগ্রহণমূলক ও শান্তিপূর্ণ নির্বাচনের জন্য মানুষের চাওয়াই ছিলো সংলাপ, যার মাধ্যমে সমাধান বেরিয়ে আসবে,” ভাষ্য মনজুরুল ইসলামের।

মনজুরুল বলেন, “এ জন্য আগামী কয়েকটি দিন খুবই গুরুত্বপূর্ণ। আগামী ৪ নভেম্বর নির্বাচন কমিশনের বৈঠকে তফসিল ঘোষণার সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। আজকেও একটি আলোচনা আছে, দেখা যাক কী হয়। দুটো জিনিস আমার কাছে পরিষ্কার হয়েছে, এই যে বরফ গলার কথা বলা হচ্ছে, আলোচনার পর কিছু কিছু প্রতিক্রিয়া আসছে। একসময় দেখা যাবে যে, আমরা হয়তো নতুন আরও কিছু অর্জনের দিকে যেতে পারি। যদিও সরকার সব দাবি মেনে নেবে বলে মনে হয় না। কিন্তু, যেটুকু ছাড় দিবে তাতে যদি একটি লেবেল প্লেয়িং ফিল্ড তৈরির সম্ভাবনা দেখা দেয়, তাহলে আমি মনে করি এটা দিয়েই ঐক্যফ্রন্ট অনেক দূর এগুতে পারবে।”

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here