মরে গিয়েও রেহাই নেই

0
303

জাহাঙ্গীর আলম মারা গেছেন দেড় বছর আগে, এক বছর আগে মনসুর আলী এবং তার ছয় মাস পর জিল্লুর রহমান। কিন্তু তারপরও তাদের বিরুদ্ধে যানবাহন ভাঙচুর এবং রাষ্ট্রবিরোধী ষড়যন্ত্রের মামলা দিয়েছে পুলিশ।

গত কয়েক সপ্তাহে রাজধানীর কদমতলী ও গেন্ডারিয়া থানায় বিএনপি নেতা-কর্মীদের বিরুদ্ধে যে মামলাগুলো হয়েছে তাতে এদের নাম এসেছে।

দ্য ডেইলি স্টারের কাছে এই তিন জনের ডেথ সার্টিফিকেট রয়েছে। তাছাড়া এদের এক জনের কবরও দেখে আসা হয়েছে। এমনকি তার দাফনের সময় উপস্থিত আত্মীয়স্বজন এবং প্রতিবেশীদের সঙ্গেও কথা হয়েছে।

মনসুর এবং জিল্লুর ছিলেন বিএনপির স্থানীয় নেতা। কিন্তু জাহাঙ্গীর কোনো রাজনৈতিক দলের সঙ্গে সরাসরি সম্পৃক্ত ছিলেন না।

এই তিন জন ছাড়াও, গত কয়েকমাসে রাজধানীর চকবাজার, কেরানীগঞ্জ ও যশোরে এক জন করে এবং হবিগঞ্জে দুই জনসহ মোট পাঁচ জনের বিরুদ্ধে একই ধরনের মামলা দেওয়া হয়েছে, যারা বহু আগেই মারা গেছেন বলে বিভিন্ন গণমাধ্যমে খবর প্রকাশিত হয়েছে।

সম্প্রতি পুলিশের শীর্ষ পর্যায় থেকে দেশের বিভিন্ন স্থানে ইউনিট প্রধানদের চিঠি দিয়ে এ ধরনের কতগুলো ‘ভূতুড়ে’ মামলা হয়েছে, সে ব্যাপারে তথ্য সংগ্রহ করতে বলা হয়েছে।

দেখা গেছে, এইসব মামলায় বিএনপির কেন্দ্রীয়, জেলা, উপজেলা ও থানা পর্যায়ে সব স্তরের নেতাদের আসামি করা হয়েছে।

এ ব্যাপারে ফোনে যোগাযোগ করা হলে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল বলেন, মৃত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে মামলা দেওয়ার বিষয়টি খতিয়ে দেখতে পুলিশ মহাপরিদর্শককে নির্দেশ দিয়েছেন তিনি।

তিনি বলেন, ‘আজও (বৃহস্পতিবার) আমি আইজিপির সঙ্গে কথা বলেছি এবং এ কাজ যারা করেছে তাদের খুঁজে বের করতে বলেছি। কিভাবে একজন মৃত ব্যক্তি একটি মামলায় আসামি হতে পারেন? এটা যাচাই করা প্রয়োজন।’

কেবল মৃত ব্যক্তিই নয়, পুলিশ এমন অনেকের বিরুদ্ধে এই ধরনের মামলা দিয়েছে, যারা সে সময় দেশেই ছিলেন না। অথবা কেউ দেশে থাকলেও যে ঘটনায় তার বিরুদ্ধে অভিযোগ আনা হয়েছে, তিনি সে সময় সেখানে উপস্থিত ছিলেন না, ছিলেন নিজের কর্মস্থলে। ভাঙচুর মামলায় আসামির তালিকায় হজ যাত্রী থেকে শুরু করে পক্ষাঘাতগ্রস্ত রোগী এমনকি শয্যাশায়ী ব্যক্তিও রয়েছেন।

পুলিশের কয়েকজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা এমন ভুলকে ‘নজিরবিহীন’ আখ্যা দিয়েছেন। তারা বলেছেন, মামলাগুলো যেমন ভুয়া, তেমনি ত্রুটিপূর্ণ। পুলিশের উচ্চপর্যায়ের নির্দেশের ভিত্তিতেই বিএনপির নেতা-কর্মীদের বিরুদ্ধে মাঠ পর্যায়ের পুলিশ এই মামলাগুলো করেছে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ওই কর্মকর্তারা আরও জানান, বিএনপির কেন্দ্রীয়, নগর, থানা ও ওয়ার্ড কমিটির তালিকা ধরে মামলা দেওয়া হয়েছে। এক্ষেত্রে নাম দিয়ে পুলিশকে সহায়তা করেছে আওয়ামী লীগের স্থানীয় ইউনিটগুলো।

তারা বলেছেন, বিএনপির প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর (১ সেপ্টেম্বর) মতো কোনো বড় কর্মসূচি ও সমাবেশের আগে তড়িঘড়ি করে মামলা দিতে গিয়ে, যাদের আসামি করা হচ্ছে তাদের মধ্যে কেউ আগেই মারা গেছেন কি না, তা নিশ্চিত হতে পারেনি পুলিশ। এমনকি কোনো কোনো মামলার বিবরণীতে যে ঘটনার বর্ণনা দেওয়া হয়েছে, তা আসলে ঘটেইনি।

গত ৩০ সেপ্টেম্বর সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের জনসভায় দলের নেতা কর্মীদের আন্দোলন ও নির্বাচনের প্রস্তুতির আহ্বান জানিয়ে সরকারবিরোধী উসকানিমূলক বক্তব্য দেওয়ার অভিযোগে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরসহ বিএনপির কেন্দ্রীয় নেতাদের বিরুদ্ধে পরদিন মামলা দেয় পুলিশ।

মামলার বিবরণীতে বলা হয়ে, ৩০ সেপ্টেম্বর রাত সোয়া ৮টার দিকে মগবাজার এলাকায় বিএনপি সমর্থকরা হাত বোমার বিস্ফোরণ ঘটায়, হত্যার উদ্দেশে পুলিশের ওপর আক্রমণ চালায়, যানবাহন ভাঙচুর করে এবং পুলিশের কাজে বাধা দেয়। পরদিন ডেইলি স্টারের একজন প্রতিবেদক মামলায় উল্লেখিত ঘটনাস্থল মগবাজার রেলগেট এলাকার দোকানদার, বাসিন্দা ও পথচারী মিলিয়ে অন্তত ১০০ জনের সঙ্গে কথা বলেন। তারা সবাই জানান মামলায় উল্লিখিত সময়ে ওই এলাকায় ভাঙচুর, হাতবোমার বিস্ফোরণের মতো কোনো ঘটনা ঘটেনি।

তবে কয়েকজন ফেরিওয়ালা জানিয়েছিলেন, মগবাজার ফ্লাইওভারের কাছ থেকে ওইদিন বিকেল ৪টা থেকে সাড়ে ৫টার মধ্যে বেশ কয়েকজন লোককে ধরে নিয়ে যায় সাদা পোশাকে থাকা একদল লোক।

মামলায় বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর ছাড়াও দলটির স্থায়ী কমিটির সদস্য মির্জা আব্বাস, মওদুদ আহমেদ, নজরুল ইসলাম খান, গয়েশ্বর চন্দ্র রায়, আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী এবং মঈন খানকেও আসামি করা হয়।

অভিযোগে পুলিশ বলছে, সমাবেশে বিএনপির নেতারা সরকারবিরোধী উসকানিমূলক বক্তব্য দেওয়ার পর ফেরার পথে দলের সমর্থকরা অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে লিপ্ত হয়। তবে মজার বিষয় হচ্ছে, আমীর খসরু গত ২৩ সেপ্টেম্বর থেকে যুক্তরাষ্ট্রে অবস্থান করছিলেন।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here