ভোটের দোলাচলে নির্জীব পুঁজিবাজার

0
289
ভোটের দোলাচলে নির্জীব পুঁজিবাজার

২০১৭ সালে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জে (ডিএসই) গড়ে লেনদেন হয়েছিল প্রায় ৯০০ কোটি টাকা। কিন্তু বছর ব্যবধানে লেনদেন প্রায় অর্ধেকে নেমেছে। সার্বিক লেনদেন প্রায় এক লাখ কোটি টাকা বা ৩৮.৪৩ শতাংশ কমার সঙ্গে পুঁজিবাজারের মূল্যসূচক, বাজার মূলধন ও বিদেশি বিনিয়োগকারীদের লেনদেনেও ভাটা পড়েছে।

জানা যায়, বছরের শুরুতে লেনদেনে গতিশীল থাকলেও ২০১৮-১৯ অর্থবছরের বাজেটে চাওয়া-পাওয়া ও একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ঘিরে বিনিয়োগকারীর সতর্কতা ও নিষ্ক্রিয়তায় বছরজুড়েই নির্জীব ছিল পুঁজিবাজার। চীনা দুই স্টক এক্সচেঞ্জকে স্টক এক্সচেঞ্জের কৌশলগত অংশীদার হিসেবে পেলেও গতিশীল হয়ে ওঠেনি বাজার। যদিও বাজার গতিশীল হবে ও বিদেশি বিনিয়োগও পুঁজিবাজারে আসবে বলে সংশ্লিষ্টরা জানালেও আশানুরূপ প্রতিফলন হয়নি। বরং নির্বাচনকে কেন্দ্র করে বিদেশি বিনিয়োগকারীদের শেয়ার বিক্রির চাপ ছিল বেশি।

পুঁজিবাজারের ২০১৮ সালের হিসাব পর্যালোচনায় দেখা যায়, এক বছরে এক লাখ ৩৩ হাজার ৫৯১ কোটি ৩৩ লাখ টাকার শেয়ার লেনদেন হয়েছে, যা গড়ে বা ২৪২ কার্যদিবসের প্রতিদিনই লেনদেন হয়েছে ৫২২ কোটি টাকা। ২০১৭ সালে এক বছরে বা ২৪৮ কার্যদিবসে লেনদেন হয়েছিল দুই লাখ ১৬ হাজার ৯৫৯ কোটি ৭১ লাখ টাকা। ওই বছর গড়ে লেনদেন হয়েছিল ৮৭৪ কোটি ৮৩ লাখ টাকা? সেই হিসাবে গত বছরের চেয়ে এ বছর প্রায় এক লাখ কোটি টাকা কম লেনদেন হয়েছে।

ডিএসই সূত্রে জানা গেছে, ২০১৮ সালে শিল্প উদ্যোক্তারা ১টি মিউচুয়াল ফান্ড ও ১৩ কম্পানি প্রাথমিক গণপ্রস্তাব বা আইপিওর মাধ্যমে ৬০১ কোটি টাকা মূলধন সংগ্রহ করেছে। যার মধ্যে দুটি কম্পানি প্রিমিয়াম বাবদ ২৩৩ কোটি ১২ লাখ টাকা মূলধন উত্তোলন করে। অপরদিকে ২০১৭ সালে দুটি মিউচুয়াল ফান্ড ও ৬টি কম্পানি মিলে ২৪৯ কোটি ২৫ লাখ টাকা মূলধন সংগ্রহ করে। এর মধ্যে একটি কম্পানি প্রিমিয়াম বাবদ ৪১ কোটি ২১ লাখ টাকা মূলধন উত্তোলন করে।

মূলধন উত্তোলন করা কম্পানির মধ্যে একটি মিউচুয়াল ফান্ডসহ মোট ১২টি সিকিউরিটিজ এক হাজার ২১২ কোটি ৩৫ লাখ টাকার পরিশোধিত মূলধন নিয়ে তালিকাভুক্ত হয়? অপরদিকে ২০১৭ সালে ৩টি মিউচুয়াল ফান্ডসহ মোট ১০টি সিকিউরিটিজ ৮৩৫ কোটি ৪২ লাখ টাকা পরিশোধিত মূলধন নিয়ে তালিকাভুক্ত হয় বলেও সূত্র জানিয়েছে।

রাইট ও বোনাস শেয়ার: ডিএসই থেকে জানা যায়, ২০১৮ সালে দুই কম্পানি ১০ কোটি ৯৪ লাখ রাইট শেয়ার ইস্যুর মাধ্যমে ২৬৮ কোটি ৫২ লাখ টাকা মূলধন সংগ্রহ করে। আগের বছর ৪টি কম্পানি ৮৬ কোটি ৮০ লাখ রাইট শেয়ার ইস্যুর মাধ্যমে মূলধন সংগ্রহ করেছিল এক হাজার ১১৪ কোটি ২ লাখ টাকা। এর মধ্যে ৩ কম্পানি প্রিমিয়ার বাবদ মূলধন উত্তোলনের পরিমাণ ছিল ২৪৬ কোটি ২ লাখ টাকা।

এদিকে ব্যাংকিং খাতের ২০টি, আর্থিক খাতের ১২টি, প্রকৌশল খাতের ২৩টি, খাদ্য ও আনুষঙ্গিক খাতের ৬টি, জ্বালানি ও বিদ্যুৎ খাতের ৭টি, টেক্সটাইল খাতের ২৯টি, ঔষধ ও রসায়ন খাতের ১৪টি, সার্ভিস অ্যান্ড রিয়েল এস্টেট খাতের ১টি, সিমেন্ট খাতের ২টি, আইটি খাতের ৪টি, ট্যানারি খাতের ২টি, সিরামিক খাতের ৩টি, ইনস্যুরেন্স খাতের ২৪টি এবং বিবিধ খাতের ৭টিসহ ১৫৪ কম্পানি ৩৫৫ কোটি ৭৬ লাখ বোনাস শেয়ার ইস্যুর মাধ্যমে তিন হাজার ৫৫৭ কোটি ৬০ লাখ টাকা মূলধন বৃদ্ধি করেছে। ২০১৭ সালে ১৪২ কম্পানি ২৭৭ কোটি ৬৮ লাখ বোনাস শেয়ার ইস্যুর মাধ্যমে দুই হাজার ৭৯১ কোটি ৬০ লাখ টাকা মূলধন বৃদ্ধি করে।

বিদেশিদের শেয়ার লেনদেন: ২০১৮ সালে বিদেশি বিনিয়োগকারীদের শেয়ার লেনদেনের পরিমাণ দাঁড়ায় ৯ হাজার ৫৮৫ কোটি ৬১ লাখ টাকা, যা ডিএসইর মোট লেনদেনের ৬.৩২ শতাংশ। এ বছর বিদেশিরা চার হাজার ৪৯৬ কোটি ২৪ লাখ টাকার শেয়ার ক্রয় করেছে কিন্তু বিক্রি করেছে পাঁচ হাজার ৮৯ কোটি ৭১ লাখ টাকার। অপরদিকে ২০১৭ সালে বৈদেশিক লেনদেনের পরিমাণ ছিল ১১ হাজার ৪৪৭ কোটি ৬৩ লাখ টাকা। যার মধ্যে ক্রয় করে সিকিউরিটিজের পরিমাণ ছিল ৬ হাজার ৫৭৬ কোটি ২৯ লাখ আর বিক্রয় করে চার হাজার ৮৭১ কোটি ৩৪ লাখ টাকা?

এ ছাড়া ডিএসই তিন সূচকের পতন ঘটেছে। ডিএসইর ব্রড ইনডেক্স আগের বছরের চেয়ে ৮৫৮ পয়েন্ট বা ১৩ শতাংশ হ্রাস পেয়েছে। ডিএসই-৩০ সূচক ৪০২ পয়েন্ট বা ১৭.৬৩ শতাংশ হ্রাস পেয়েছে। আর ডিএসইএক্স শরিয়াহ্ সূচক ১৫৭ পয়েন্ট বা ১১ শতাংশ হ্রাস পেয়েছে।

বাজার মূলধন কমেছে ব্যাপকহারেই। ২০১৭ সালের তুলনায় এ বছর মূলধন কমেছে ৩৫ হাজার ৫৯৯ কোটি টাকা বা ৮.৪২ শতাংশ। ২০১৭ সালে বিদেশিদের লেনদেন বেড়েছিল ২ হাজার ৬৭৪ কোটি ৩৪ লাখ টাকা বা ৩০.৪৮ শতাংশ, যা বিদেশিদের লেনদেনে অতীতের সব রেকর্ড ভঙ্গ করে। ২০১৭ সালে বিদেশি বিনিয়োগকারীদের মোট লেনদেন ছিল ১১ হাজার ৪৪৭ কোটি ৬৩ লাখ টাকা।

ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) ব্যবস্থাপনা পরিচালক কে এ এম মাজেদুর রহমান বলেন, কৌশলগত বিনিয়োগকারী হিসেবে বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় দুই স্টক এক্সচেঞ্জকে যুক্ত করা বাজারের জন্য ইতিবাচক দিক। তাদের এ অন্তর্ভুক্তি বিশ্ববাজারে বাংলাদেশের পুঁজিবাজারকে পরিচিত করার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। বিদেশি বিনিয়োগ আকৃষ্ট করার ক্ষেত্রেও ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

তিনি বলেন, নির্বাচনী বছরে বাজার কিছুটা গতি মন্থর দেখা গেছে। তার পরও আশানুরূপ যে গতি অর্জন করার কথা ছিল তা অর্জন করতে না পারলেও দেশের পুঁজিবাজার এমন একটি মাত্রায় অবস্থান করতে পেরেছে, যার ফলে বাজারে তেমন কোনো সংকট দেখা দেয়নি। এ বছরে নতুন কিছু পণ্য চালুর কথা ছিল কিন্তু না হওয়ায় আগামী বছরে হবে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here