আচরণবিধি, সংঘর্ষ ও ইসির ইভিএম ব্যস্ততা

0
271

গত শুক্রবার আওয়ামী লীগ মনোনয়ন ফরম বিক্রি শুরু করলে, ধানমন্ডি কার্যালয়ের সামনে কয়েক হাজার নেতাকর্মীর সমাবেশ ঘটে। যানজট এবং আবাসিক এলাকার বাসিন্দারা সমস্যায় পড়ে। গণমাধ্যমে সংবাদ প্রকাশিত হয়। আচরণবিধি লঙ্ঘিত হচ্ছে, মর্মে অভিযোগ উঠে। নির্বাচন কমিশন জনসমাগমকে ‘ভোট উৎসব’ হিসেবে দেখে ‘আচরণবিধি’ লঙ্ঘন হিসেবে নয়।

৪ দিন পর অবস্থান পরিবর্তন করতে দেখা যায় নির্বাচন কমিশনকে।লোক সমাগমকে দেখতে শুরু করে ‘আচরণবিধি’ লঙ্ঘন হিসেবে। ব্যবস্থা নিতে পুলিশকে চিঠি দেয় নির্বাচন কমিশন।

নির্দেশনার চিঠি পৌঁছানোর পর ব্যবস্থা নিতে উদ্যোগী হলো পুলিশ। নয়া পল্টনে বিএনপি কার্যালয়ের সামনে তখন কয়েক হাজার নেতাকর্মী। যান চলাচল বন্ধ। পুলিশ সরিয়ে দিতে চাইল নেতাকর্মীদের। এর আগের ৩ দিন আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীদের কিছু বলেনি পুলিশ। কারণ তখন পর্যন্ত নির্বাচন কমিশন পুলিশকে ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশনা দেয়নি।

বিএনপি নেতাকর্মীদের বক্তব্য, আওয়ামী লীগকে কিছু বলেননি, আমাদের কেন বলছেন?

বেধে যায় সংঘর্ষ। শুরু হলো পুলিশি অ্যাকশন, বিএনপি নেতাকর্মীদের সঙ্গে ধাওয়া পাল্টা ধাওয়ায় রণক্ষেত্র হয়ে উঠল পল্টন এলাকা। পুলিশের গাড়িতে আগুন দিল নেতাকর্মীরা। পুলিশের লাঠিচার্জ এবং কাঁদানে গ্যাস নিক্ষেপ, ছররা গুলিতে ছত্রভঙ্গ হয়ে গেল বিএনপি নেতাকর্মীরা।

নির্বাচনের দেড় মাসেরও কম সময় আগে রাজনীতি উত্তপ্ত হয়ে উঠল। পুলিশের সঙ্গে বিএনপি নেতাকর্মীদের সংঘর্ষ হওয়ায়, নতুন করে প্রশ্ন উঠতে পারে সমান সুযোগ না দেওয়ার।

নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার পর থেকে নির্বাচন অনুষ্ঠান সম্পন্ন না হওয়া পর্যন্ত কী করা যাবে, কী করা যাবে না, এবিষয়ে রাজনৈতিক দল ও প্রার্থীদের জন্যে নির্বাচন কমিশনের একটি আচরণবিধি আছে।

মনোনয়ন ফরম বিক্রির সময় নেতাকর্মীদের সমাবেশ ঘটাতে দেওয়া যাবে না, এমন কোন নিষেধাজ্ঞা আচরণ বিধিতে নেই।

আওয়ামী লীগের ফরম বিক্রির প্রথম ৩ দিন জনসমাগমকে নির্বাচন কমিশন আচরণ বিধির লঙ্ঘন বলেনি। বিএনপি মনোনয়ন ফরম বিক্রির প্রথম দুই দিন জনসমাগমকেও আচরণ বিধির লঙ্ঘন বলে অবিহিত করা হয়নি। কিন্তু মঙ্গলবার আকস্মিকভাবে নির্বাচন কমিশন লোক সমাগমকে ‘আচরণবিধি’ লঙ্ঘন হিসেবে আখ্যায়িত করে ব্যবস্থা নিতে পুলিশকে চিঠি দেয়। ফলাফল- শান্ত পরিস্থিতি অশান্ত হয়ে উঠল।

তবে আজকের ঘটনার আরও বিস্তারিত তথ্যের জন্যে অপেক্ষা করতে হবে। আমরা নির্বাচন কমিশনের কার্যক্রমের দিকে নজর দিতে চাই।

১. আরও কয়েক মাস আগে থেকেই নির্বাচন কমিশন বলে আসছে নির্বাচন অনুষ্ঠানের জন্যে তারা ‘শতভাগ প্রস্তুত’। তাই যদি হয় তবে, চার দিন নির্বিঘ্নে রাজনৈতিক দল দুটি ‘আচরণবিধি’ লঙ্ঘন করে যেতে পারল কীভাবে? ‘শতভাগ প্রস্তুতি’র বিষয়টি আসলে কী?

গত কয়েক মাস নির্বাচন কমিশনের কার্যক্রম গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করার চেষ্টা করেছি। তার ভিত্তিতে বহুবার বলেছি -লিখেছি, নির্বাচনের প্রস্তুতি কাজে নির্বাচন কমিশনের বড় রকমের ঘাটতি পরিলক্ষিত হচ্ছে। বিশেষ করে নীতিগত সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে অর্থাৎ নির্বাচন কমিশন কঠোরভাবে তার ক্ষমতা প্রয়োগ করবে কি না, কতটা করবে, প্রশাসনের উপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করবে কীভাবে, এক্ষেত্রে প্রতিবন্ধকতাগুলো কোথায়, এমপি বা মন্ত্রীদের কীভাবে বা কোন প্রক্রিয়ায় আইন মানতে বাধ্য করবে, সে বিষয়ে কোনো প্রস্তুতি নির্বাচন কমিশনের আছে বলে মনে হচ্ছিল না। ৮ নভেম্বর তফসিল ঘোষণার সঙ্গে সমন্বয় রেখে, নির্বাচনী কাজের সঙ্গে সম্পৃক্ত মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তাদেরও সুনির্দিষ্ট কিছু জানায়নি নির্বাচন কমিশন। তাদের সঙ্গে মিটিং করেছে ৫ দিন পরে, ১৩ নভেম্বর। তফসিল ঘোষণার পর প্রথম ৩ দিন আওয়ামী লীগ মনোনয়ন ফরম বিক্রি করেছে। তারপর বিএনপি পল্টন অফিস থেকে মনোনয়ন ফরম বিক্রি শুরু করছে।  আওয়ামী লীগের ফরম বিক্রির শেষে বিএনপির ফরম বিক্রির মাঝে লোক সমাগমকে ‘আচরণবিধি’ হিসেবে আখ্যা দিয়ে তৎপর হয়েছে নির্বাচন কমিশন। সমসুযোগ না দেওয়া বা বিএনপির প্রতি বৈরি আচরণ করছে, এই অভিযোগে অভিযুক্ত হচ্ছে নির্বাচন কমিশন। সঠিক সময়ে সঠিক পদক্ষেপ না নিয়ে বিতর্কের কেন্দ্রে পরিণত হচ্ছে নির্বাচন কমিশন।

নির্বাচন অনুষ্ঠানের জন্যে যত রকমের সরঞ্জাম প্রয়োজন হয়, সেই প্রস্তুতি নির্বাচন কমিশনের আছে। এক্ষেত্রে ‘শতভাগ প্রস্তুতি’ বিষয়ক ইসির দাবি সঠিক। বলে রাখা দরকার, বাংলাদেশের নির্বাচন কমিশনের সরঞ্জাম বিষয়ক কাজের প্রায় ৫০ বছরের অভিজ্ঞতা রয়েছে। সেই অভিজ্ঞতা থেকেই নির্বাচন কমিশনের কর্মকর্তারা সরঞ্জাম প্রস্তুত ও তৃণমূল পর্যায়ে যথাসময়ে সরবরাহ করতে পারেন। তা করছেনও। এ যাবৎকালের কোনো নির্বাচনেই তার ব্যত্যয় ঘটেনি। এর জন্যে প্রধান নির্বাচন কমিশনার বা অন্য নির্বাচন কমিশনারদের তেমন কৃতিত্ব নেওয়ার সুযোগ নেই। তাদের কৃতিত্ব নেওয়ার সুযোগ মনোনয়ন ফরম জমা দেওয়ার সময় থেকে নানা পর্যায়ে ‘আচরণবিধি’ পালনে রাজনৈতিক দলগুলোকে বাধ্য করতে পারা, সমান সুযোগ তৈরি এবং সর্বোপরি একটি সুষ্ঠু ও বিশ্বাসযোগ্য নির্বাচন করতে পারার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট।  ‘সমান সুযোগ’র বিষয়টি সম্ভবত কল্পনার বিষয়ে পরিণত হতে যাচ্ছে।

২. বাংলাদেশের রাজনৈতিক বাস্তবতায় বিএনপি বা আওয়ামী লীগ, দুটি রাজনৈতিক দলের একটি নির্বাচনে অংশ না নিলে, সেই নির্বাচনটি প্রতিযোগিতামূলক হয় না। যেমন হয়নি ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির নির্বাচন। স্বাভাবিকভাবেই সেই নির্বাচনে নির্বাচন কমিশনের কর্মযজ্ঞও ছিল অনেক কম। এবারের নির্বাচন তার সম্পূর্ণ ব্যতিক্রম। সব দল নির্বাচনে অংশ নিলে যে কর্মযজ্ঞ, সম্ভবত সে বিষয়ে ধারণা করতে পারেনি বর্তমান নির্বাচন কমিশন। সব দল নির্বাচনে অংশ নেওয়ার সিদ্ধান্তের পর, নির্বাচন কমিশনের প্রস্তুতির দুর্বলতা দৃশ্যমান হয়ে পড়েছে। নির্বাচন কমিশন স্বীকার করতে না চাইলেও, ভেতরে ভেতরে যে তারা বেশ বিচলিত, তা বোঝা যাচ্ছে। এক্ষেত্রে এখন যে সামর্থ্যের সর্বোচ্চটা দিয়ে চেষ্টা করা দরকার, তাও পরিলক্ষিত হচ্ছে না।

৩. প্রধান নির্বাচন কমিশনার ও সচিব সর্বশক্তি নিয়োগ করেছেন ইভিএমের পেছনে। প্রথমাবস্থায় অন্য কমিশনারদের এবিষয়ে অবগত না করে, তারা দু’জন এই সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। একজন নির্বাচন কমিশনারের নোট অব ডিসেন্টের পর বিষয়টি দৃশ্যমান হয়। তারপর সিইসি ও সচিব অন্য তিনজন কমিশনারকেও ইভিএম বিষয়ক সিদ্ধান্তের সঙ্গে সম্পৃক্ত করেছেন। তাতে যদিও ইভিএম বিষয়ক রহস্য ও বিতর্ক চাপা পড়েনি।

ঠিক কত আসনে নির্বাচন কমিশন ইভিএমে ভোট গ্রহণ করতে চায়, তা পরিষ্কার করেনি। ইসি সচিব প্রথমে ১০০ আসনে ইভিএম ব্যবহারের ধারণা দিয়েছিলেন। বলেছিলেন, রাজনৈতিক দলগুলো ‘একমত’ হলে ইভিএম ব্যবহার করা হবে। এখন আর ‘একমত’র কথা বলছে না ইসি।

সর্বশেষ প্রধান নির্বাচন কমিশনার জাতির উদ্দেশ্য দেওয়া ভাষণে ‘অল্প কিছু’ কেন্দ্রে ইভিএম ব্যবহারের কথা বলেছেন। ‘অল্প কিছু’ শব্দটি বিভ্রান্তিকর। ১০০ আসন ‘অল্প কিছু’ না ১০০ কেন্দ্র ‘অল্প কিছু’- তা পরিষ্কার করেনি নির্বাচন কমিশন। অন্য যেকোনো বিষয়ের চেয়ে নির্বাচন কমিশন অনেক বেশি সময় ব্যয় করছে ইভিএমের পেছনে।

সিইসি বলেছেন, ইভিএম থেকে পিছিয়ে আসার সুযোগ নেই। কেন নেই, তার গ্রহণযোগ্য ব্যাখ্যা নেই। পৃথিবীর উন্নত অনেক দেশ যে ইভিএম ত্যাগ করেছে, তাও বিবেচনায় নিচ্ছে না নির্বাচন কমিশন। নির্বাচন কমিশনের একটি সূত্র জানায়, ইভিএম ব্যবহারকারী আসনের সংখ্যা ইসি সচিব প্রথমে যা বলেছিলেন ,ভেতরে ভেতরে এখনো সেই অবস্থানেই আছে নির্বাচন কমিশন।

ইভিএম বিষয়ক রহস্য- বিতর্কের এখানেই শেষ নয়। ইসি সচিব বলেছেন, ইভিএমে ভোট গ্রহণ কেন্দ্রগুলোর দায়িত্ব সেনাবাহিনীকে দেওয়া হবে।নির্বাচন কমিশনার রফিকুল ইসলাম বলেছেন, ইভিএম  টেকনিক্যাল বিষয়, কোনো টেকনিক্যাল ত্রুটি দেখা দিলে সেনাবাহিনী দ্রুত মেরামত করে দিতে পারে, সে কারণে সেনাবাহিনীর সিগন্যাল এবং ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগকে দায়িত্ব দেওয়া হবে। প্রশ্ন এসেছে, তাহলে ইভিএম কেন্দ্রগুলোতে ভোট গ্রহণের দায়িত্ব কি সেনাবাহিনীকে দেওয়া হবে? সাবেক নির্বাচন কমিশনার ব্রিগেডিয়ার (অ:) সাখাওয়াত হোসেন দ্য ডেইলি স্টার অনলাইনকে বলেছেন, ‘ভোট গ্রহণের কাজে সেনাবাহিনীকে ব্যবহার করার সুযোগ নেই।’

‘শতভাগ প্রস্তুত’ ইভিএম ব্যবহারে এত আগ্রহ, তাহলে টেকনিক্যাল দক্ষতাসম্পন্ন লোকবল নেই কেন নির্বাচন কমিশনের?

৪. নির্বাচন কমিশন যখন ৮ নভেম্বর তফসিল ঘোষণার উদ্যোগ নেয়, বিরোধী দলগুলো তড়িঘড়ি না করে তফসিল ঘোষণার তারিখ পেছানোর দাবি জানায়। প্রধান নির্বাচন কমিশনার বলেন ‘তফসিল পেছানোর সুযোগ নেই’। তারপর যদিও ৭ দিন পিছিয়ে নির্বাচনের দিন ধার্য করেছেন ৩০ ডিসেম্বর। ‘সুযোগ নেই’- প্রধান নির্বাচন কমিশনার একথা কেন বললেন?

বিএনপি নেতৃত্বাধীন জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট নির্বাচন আরও একমাস পেছানোর দাবি তুলেছেন। প্রধান নির্বাচন কমিশনার আবারও বলছেন ‘নির্বাচনের তারিখ পেছানোর আর সুযোগ নেই’। বর্তমান সংসদের মেয়াদ শেষ হবে ২৮ জানুয়ারি। সেই হিসেবে ৩০ ডিসেম্বর নির্বাচন এবং ফলাফল ঘোষণার পরও প্রায় ২৫ দিন সময় হাতে থাকবে। জানুয়ারি মাসে নির্বাচনের নানা সীমাবদ্ধতার কথাও আলোচনায় আছে। বিশ্ব এজতেমা- শীত- আবহাওয়ার বিষয়গুলো সামনে আনা হচ্ছে।

রাজনৈতিক বা দলীয় সরকারের অধীনে জাতীয় নির্বাচন সুষ্ঠু বা গ্রহণযোগ্য করা অত্যন্ত কঠিন কাজ। দলীয় সরকারের প্রশাসন আগামী দেড় মাস নির্বাচন কমিশনের সব নির্দেশ মেনে চলবে, বিষয়টি এমন সরল নয়। নির্বাচন কমিশন যদি কাগুজে ক্ষমতার শক্ত প্রয়োগ দৃশ্যমান করতে পারে, তবে প্রশাসনের উপর নিয়ন্ত্রণ কিছুটা হলেও প্রতিষ্ঠার সম্ভাবনা ছিল। তার যে নমুনা দেখা গেল, তাতে আশান্বিত হওয়া মুশকিল। যে সাংঘর্ষিক অবস্থা আজ তৈরি হলো, তার থেকে নানাবিধ শঙ্কা তৈরি হলো নির্বাচনকে ঘিরে।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here